ভ্রমণবন্ধু

রমনা পার্ক - Hosted By

Not review yet
4
Add Review Viewed - 308

অট্টালিকাবদ্ধ রাজধানী ঢাকাতে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক হওয়ার কারণে কোথাও দম ফেলার তেমন ফুরসত নেই। কোথাও একটু ফাঁকা জায়গা নেই; নেই একটু নির্মল বাতাস। তবে শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রমনা পার্কে গেলে কিছুটা হলেও সতেজ বাতাস পাবেন। শুধু তাই নয়, অচেনা পাখির কলকাকলিতে প্রশান্তি খুঁজে পাবেন। এখানে রয়েছে শিশুদের বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা। প্রতিদিন মানুষ সকাল-বিকাল এখানে হাঁটাহাঁটি করতে আসেন।

ঐতিহ্যবাহী এই পার্কটি ঘন ঘাস, লতাগুল্ম, ছোট ও মাঝারি গাছ, মৌসুমি ফুলে সমৃদ্ধ। এখানে রয়েছে অতি দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ ও পাখি। রমনায় রয়েছে ১৯টি রেইন্ট্রি গাছ। এর একেকটি গাছ বড় হলে দেড় বিঘা জায়গা দখল করবে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। রয়েছে ৩৫০টি মেহগনি গাছও। সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে জাম, জলপাই, হরিতকি, পেয়ারা গাছ। পার্কের উত্তর পাশ লাগোয়া হেয়ার রোডে রয়েছে পাদাউক গাছ। পার্কে অসংখ্য গাছপালার ভিড়ে কিছু ফল এবং ঔষধি গাছও দেখা যায়। সবচেয়ে পুরনো মহুয়াগাছটি পার্কের প্রায় মাঝখানে অবস্থিত ছিল। মহুয়াগাছের পূর্বদিকে আছে মিলেশিয়া ও গুলাচ। পার্কের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে আছে এক নামে পরিচিত রমনা বটমূল।

বৈচিত্র্য থাকায় রমনা পার্কে সারা বছরই কিছু না কিছু ফুল থাকে। পার্কে একটি সুন্দর অশোকবীথি আছে পূর্ব পাশে। বর্ষায় ঢাকায় আর কোথাও কেয়া না ফুটলেও রমনার কেয়া ফুল একেবারেই নিয়মিত। হেমন্তে ফোটে ধারমার বা পীতপাটলা। একদিনের আকর্ষণীয় ফুল পাদাউক। বসন্তের কোনো একদিন সোনালী হলুদ রঙের ফুলে ভরে ওঠে গাছ। পার্কের উত্তর পাশে আছে রক্তলাল কৃষ্ণচূড়া।

গণপূর্ত অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রমনার আয়তন ৬৮ দশমিক ৫০ একর। ১৯৪৯ সালে এখানে উদ্ভিদ প্রজাতি ছিল ৭১টি। এরপর ক্রমেই তা বেড়েছে। বর্তমানে উদ্ভিদ প্রজাতি ২১১টি। এর মধ্যে ফুল ও শোভাবর্ধক প্রজাতির সংখ্যা ৮৭টি, ফলজাতীয় উদ্ভিদ ৩৬টি, ঔষধি প্রজাতি ৩৩টি, কৃষি বনায়নের উদ্ভিদ প্রজাতি ৩টি, বনজ উদ্ভিদ প্রজাতি ২টি, জলজ উদ্ভিদ প্রজাতি ২টি ও মশলা উদ্ভিদ প্রজাতি ৩টি। পার্কটিতে একটি লেক রয়েছে। স্থানভেদে ৯ থেকে ৯৪ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত লেকটি লম্বায় ৮১২ মিটার।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৬১০ সালে মোঘল আমলে এই উদ্যানটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মোঘলরাই রমনার নামকরণ করেন। এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন মোঘল সেনাপতি ইসলাম খান। রমনা শব্দের অর্থ ‘সবুজ ঘাসে ঢাকা চত্বর’।

শুরুতে রমনা পার্ক বর্তমান পরিসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রমনার অবস্থান ছিল পুরনো হাইকোর্ট ভবন থেকে বর্তমান সড়ক ভবন পর্যন্ত। এটি মোঘলদের তৈরি বাগিচা বাগান। ইংরেজ আমলে সেটাই ‘রমনা গ্রিন’ ও ‘রমনা পার্ক’ নামে পরিচত হয়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে রমনা অযত্ন-অবহেলায় বিশাল জঙ্গলে পরিণত হয়। পরে ১৯ শতকে ব্রিটিশ শাসক এবং ঢাকার নবাবদের সহায়তায় ঢাকা শহরের নিসর্গ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রমনা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯০৮ সালে লন্ডনের খ্যাতনামা কিউই গার্ডেনের কর্মী ক্রাইড লকের তত্ত্বাবধানে ‘রমনা পার্কে’র পুনর্গঠন কাজ শুরু হয়। পত্রপল্লবে শোভিত রমনা এ সময় ঢাকা শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সকালে-বিকালে এখানে মানুষের সমাগম ঘটতে থাকে।

শরীরচর্চা ছাড়াও রমনা ছিল নাগরিক জীবনের বিনোদনের অংশ। রমনায় সে সময় ঘোড়ার দৌড় থেকে শুরু করে অনেক সাংস্কৃতিক উৎসব হত। একসময় রমনা ভাগ করে রেসকোর্স পৃথকভাবে শুরু করা হয়, যেটা এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত। ঢাকার মানুষেরা সকাল বা সান্ধ্য ভ্রমণে বের হয়ে রমনায় আসতেন।

রমনার দিনলিপি কেবল সকাল বা সান্ধ্য ভ্রমণে বের হওয়া মানুষের কলকাকলিতে সীমিত থাকেনি। পাকিস্তান আমলে নতুন রূপে হাজির হয় রমনা। নতুনভাবে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে রমনার বটমূলে। ষাটের দশক থেকে রমনার বটমূল আমাদের সংস্কৃতি এবং সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক স্থান। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে এখানে প্রথম বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ছায়ানটের স্বেচ্ছাসেবীরা জায়গাটি পরিচ্ছন্ন করে। বটগাছের নিচে সেই গানের আসর বসে। তখন থেকেই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন।

রমনা পার্ক ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা সংগঠন। বাহারি নামের এসব সংগঠনগুলো হলো- ক্ষণিকের মিলন, শতায়ু অঙ্গন, মহিলা অঙ্গন, রমনা ঊষা সংঘ, সুপ্রভাত, ব্যতিক্রম, বনলতা, ভোরের বিহঙ্গ, কিছুক্ষণ, অগ্নিবীণা, রমনা প্রভাতী, জাহাঙ্গীর সার্কেল এবং ক্ষণিকা। সাধারণত সকাল-সন্ধ্যায় হাঁটতে আসা মানুষরাই রমনা পার্ক ঘিরে এসব সংগঠন গড়ে তুলেছেন।

Tags

Add Reviews & Rate

You must be logged in to post a comment.

Sign In ভ্রমণবন্ধু

For faster login or register use your social account.

or

Account details will be confirmed via email.

Reset Your Password