ভ্রমণবন্ধু

ময়মনসিংহ ডে ট্যুর; কোথায় যাবেন কি দেখবেন - Hosted By

Not review yet
3
Add Review Viewed - 168

ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় চাইলেই ময়মনসিংহ ডে ট্যুর করা যায়। আলেকজান্ডার ক্যাসেল, শশী লজ, জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। এছাড়া ময়মনসিংহ গেলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রহ্মপুত্র নদটিও দেখে আসা যায়।

ভারতবর্ষের বৃহত্তম জেলা ময়মনসিংহ নিয়ে একটা জনপ্রিয় প্রবাদ প্রচলিত আছে। বলা হয়- “হাওর, জঙ্গল, মহিষের শিং, এই তিন নিয়ে ময়মনসিং”। এখানে রয়েছে প্রাচীন স্থাপনার সব অনবদ্য কীর্তি, যেগুলো এই জেলাকে পরিচিত করছে পুরো বাংলাদেশে। আজ আমরা আপনাদের ময়মনসিংহ জেলায় বেড়াতে গেলে কোথায় যাবেন, কি দেখবেন সেটা জানাবো।

শশী লজ:

ময়মনসিংহ শহরের ঠিক মাঝখানেই অবস্থিত শশীলজ। প্রাচীন জমিদার প্রথার নানা স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাটি। মুক্তাগাছার জমিদার বানিয়েছিলেন এই বাড়িটি। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে জমিদার মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী দৃষ্টিনন্দন এই দুই তলা ভবনটি তৈরি করেন। জমিদার সূর্যকান্ত নিঃসন্তান ছিলেন। পরে দত্তক ছেলে মহারাজ শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে ভবনটির নাম রাখা হয় শশী লজ।

যারা হুমায়ূন আহমেদের সাড়া জাগানো ধারাবাহিক ‘অয়োময়’ দেখেছেন তাদের কাছে এটি বেশ পরিচিত মনে হবে। কারণ বিখ্যাত সেই নাটকের কিছু অংশ এইখানে শুট করা হয়েছিল।

শশীলজে ঢুকেই দেখতে পাবেন সুন্দর একটি বাগান। আর বাগানের মাঝখানে শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। এই ফোয়ারার মাঝেই বিশাল গ্রিক দেবী ভেনাসের এক মর্মর মূর্তি। গ্রিক কারুকার্যে অসম্ভব সুন্দর মূর্তি আপনাকে আনন্দ দেবে নিঃসন্দেহে।

শশী লজে মোট ১৮টি বড় বড় ঘর রয়েছে। আর এখানে ৯ একরের বিশাল প্রাঙ্গনের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গাটি ভবনের পেছন দিকে থাকা স্নানঘর, ঘাট ও পুকুর। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি মার্বেল পাথর দিয়ে বাধানো ঘাটটি আপনার ভালো লাগবেই। একসময় এখানে বসেই রানি পাশের পুকুরে ভেসে বেড়ানো হাঁসের খেলা দেখতেন। এছাড়া পুকুর পাড়ে হাওয়া খাওয়ার জন্য তৈরি করেছিলেন দ্বিতল ছোট্ট ভবন। ঘাটের পাশের প্যাচানো সিড়িটা বেশ বৈশিষ্টমন্ডিত।

১৯৫২ সালে মহিলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজ-এর কাজ চলতো শশী লজে। বাড়িটির মূল অংশ কলেজের অধ্যক্ষের কার্যালয় ও দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। তবে ২০১৫-এর এপ্রিল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা দেয় শশী লজটিকে। এখন সাধারণ দর্শণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ১০ টাকার টিকিট কেটে আপনিও উপভোগ করতে পারেন এই সুন্দর জায়গাটি।

শশী লজ ভিডিও লিংক

আলেকজান্ডার ক্যাসেল:

এই ক্যাসেলটি ঊনবিংশ শতকের স্থাপনা। নাম আলেকজান্ডার ক্যাসেল। শশী লজ যে জমিদার নির্মাণ করেছিলেন সেই মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্যই এটি বানিয়েছেন। মহারাজা সূর্যকান্ত সংস্কৃতিসেবী মানুষ ছিলেন। ময়মনসিংহ তথা পুরো বাংলার থিয়েটারের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন তিনি। সেই সময়ে এই ক্যাসেল নির্মানে ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকা।

মহারাজা সূর্যকান্ত জুবিলি উৎসব পালনের জন্য তখনকার ব্রিটিশ সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রা’র নামে বাড়িটি তৈরি করেন। এজন্য এই বাড়িটিকে “আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল” নামেও ডাকে কেউ কেউ। এছাড়া ক্যাসলটি নির্মাণে লোহা ব্যবহার বেশি হয়েছিল বলে এটি মানুষের কাছে ‘লোহার কুঠি’ নামেও পরিচিত। স্থানীয়ভাবে এখনো এ নামেই পরিচিত প্রাসাদটি।

বাড়িটির সাথে একসময় মন শান্ত করা দীঘি ও বাগান থাকলেও এখন আর নেই। সামনের মূল গেটের সাথে লাগানো আছে দুটি গ্রিক মূর্তি। যদিও মূর্তিগুলো এখন ভেঙে পরেছে। পুরো বাড়িটিই একটা স্তম্ভমূলের উপর দাঁড়িয়ে আছে।

আলেকজান্ডার ক্যাসেল ভিডিও লিংক

ব্রহ্মপুত্র নদ:

ময়মনসিংহ এসেছেন কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদ না দেখে যাবেন সেটা কেমন হয়। কারণ নদী আপনাকে কাছে টানবেই। ব্রহ্মপুত্র নদ এশিয়া মহাদেশেরই এক গুরুত্বপূর্ণ নদী। ঠিক শহরের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদ ধরে নৌকায় ঘুরলেই আপনার ময়মনসিংহ ভ্রমণ সার্থক হবে। সো অবশ্যই নৌকা ভাড়া করে ঘুরবেন। তবে আগে থেকে ভাড়া মিটিয়ে নিবেন, তাছাড়া অনেকগুলো টাকা বেশি খরচ করতে হবে কিন্তু।

জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা:

আপনি যদি একদিনের ট্যুরে ময়মনসিংহ আসেন তাহলে আমি বলবো শহরটি ঘুরে দেখুন। কারণ এই শহরেই ঘুরে দেখার মত অনেক কিছু পাবেন। এই যেমন ব্রহ্মপুত্র নদের পাশেই খোঁজ পাবেন বিরাট এক সংগ্রহশালার। নাম শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা। ময়মনসিংহ শহরের অন্যতম প্রধান এই আকর্ষণ এই সংগ্রহশালা।

জয়নুল আবেদীন ছিলেন সাদা মনের মানুষ, কিন্তু পুরো দেশটিকে নিজের মনের রঙে তিনি ফুঁটিয়ে তুলেছেন সাদা কাগজ আর ক্যানভাসে। দেশ ও সমাজের অসঙ্গতি, বৈষম্য এবং সমসাময়িক বাস্তবতার নানা চিত্র ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। ও আপনারা নিশ্চয় জানেন মহান এই শিল্পীর জন্ম কিন্তু এই শহরেই।

শিল্পাচার্যের বেড়ে ওঠার এই ভূমিতেই ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে তার কালজয়ী চিত্রকর্ম ও আনুষঙ্গিক বেশকিছু ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে সংগ্রহশালাটি। ১৯৭৫ সালের ১৫ এপ্রিল নিজ উদ্যোগ এবং জেলা প্রশাসনের সহায়তায় তার আঁকা ৭০টি চিত্রকর্ম নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এই সংগ্রহশালাটি।

সংগ্রহশালাটির প্রথম গ্যালারিতে ঢুকতেই চোখে পড়বে শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবনের নানা ছবি। একটু সামনে এগুতেই গ্যালারির ভিতরে দেখতে পাবেন আঁকার জন্যে তার ব্যবহৃত ইজেল, তুলি, দোয়াতসহ বেশকিছু সামগ্রী। এছাড়া বিখ্যাত ‘মনপুরা ৭০’-এর অনুকৃতিও রয়েছে এই সংগ্রহশালায়।

তৃতীয় গ্যালারিতে দেখবেন দুর্ভিক্ষ সিরিজের বেশকিছু চিত্রকর্ম। এছাড়া শিল্পাচার্যের আঁকা বিদেশের ছবি ও তৈলচিত্রে কিছু অসম্পন্ন ছবি রাখা আছে সংগ্রহশালায়। একটি ভালো সংবাদ হচ্ছে যারা জয়নুল আবেদিনের ছবি নিয়ে বই, বুকলেট ও কার্ড সংগ্রহ করতে চান তারা সহজেই এখানকার বিক্রয়কেন্দ্র থেকে এসব কিনতে পারবেন।

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সাহেব কোয়ার্টার নলিনী রঞ্জন সরকারের বাড়িতে এ সংগ্রহশালাটি অবস্থিত। সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা ভিডিও লিংক

মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি:

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলায়, শহর থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে মুক্তাগাছা রাজবাড়ির অবস্থান। মুক্তাগাছার জমিদার ব্রিটিশ কর্তৃক মহারাজা উপাধি পেয়েছিলেন বলে জমিদারের বাসভবনটি রাজবাড়ি বলে স্বীকৃত। মহারাজা আচার্য চৌধুরী বংশের প্রথম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী ছিলেন বগুড়ার বাসিন্দা। তিনিই এই প্রাসাদ নির্মান করেন।

মুক্তাগাছার জমিদারির মোট অংশ ছিল ১৬টি। এখানে ১৬ জন জমিদার শাসন করতেন। রাজবাড়িটির প্রবেশ মুখে রয়েছে সিংহের মূর্তিসহ বিশাল ফটক। সব বাড়ি মিলে প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এই রাজবাড়িটি। যদিও এর অনেক অংশ দখল হয়ে রাজবাড়িটির আয়তন কমে গেছে।

মুক্তাগাছা রাজবাড়িটি প্রাচীন স্থাপনাশৈলির অনন্য নিদর্শনও বটে। ময়মনসিংহ শহর থেকে সময় নিয়ে বাস কিংবা ভাড়া অটরিক্সা করে যেতে হবে মুক্তাগাছায়। মুক্তাগাছা কিন্তু মণ্ডার জন্য বিখ্যাত। তাই মণ্ডা টেস্ট করতে মিস করবেন না। বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো মণ্ডা এখানে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়:

দেশের কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। একটু ঘুরে দেখলেই প্রমাণ পাবেন কেন এখানে আসবেন। এজন্য বলছি যারা ময়মনসিংহে ঘুরতে আসেন, তারা একবার হলেও বেড়িয়ে যান সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাস থেকে। কৃষি নিয়ে নানা ধরনের গবেষণার পাশাপাশি নানা জাতের উদ্ভিদের দেখা মিলবে। আর মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নদী ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য্য আরো বাড়িয়েছে।

ক্যাম্পাসের প্রধান গেট পার হলেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন মিলনায়তন। এর সামনে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে মহান মুক্তি সংগ্রামে বাংলার সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মূর্তপ্রতীক বিজয় একাত্তর ভাস্কর্য।

ভাস্কর্যে একজন কৃষক মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরেছে আকাশের দিকে। তার ডান পাশেই শাশ্বত বাংলার সর্বস্বত্যাগী ও সংগ্রামী নারী দৃঢ়চিত্তে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছেন। যার সঙ্গে আছে রাইফেল। অন্যদিকে একজন ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে গ্রেনেড ছোড়ার ভঙ্গিমায় বাম হাতে রাইফেল নিয়ে তেজোদীপ্ত চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে।

বোটানিক্যাল গার্ডেনে:

বোটানিক্যাল গার্ডেনে একবার বেড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ খোঁজেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে আসা দর্শনার্থীরা। গাছের বৈচিত্র সম্ভারে এটি দেশের সেরা। কারণ এখানে প্রায় সাড়ে পাঁচশো প্রজাতির বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেড়াতে আসা মানুষের জন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান হলো জার্মপ্লাজম সেন্টার। এখানে দেখবেন নানাজাতের ফল, ওষধি এবং কৃষিজাত শস্য। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জার্মপ্লাজম সেন্টার। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির পরেই এর অবস্থান।

ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা মানুষের অন্যতম আকর্ষণ থাকে নানাজাতের ফলের চারা কেনার। এই জার্মপ্লাজম সেন্টারে উদ্ভাবিত ২৩৫ ধরনের আম, ২৭ ধরনের লিচু, ৫৭ ধরনের পেয়ারা, ৪৮ ধরনের লেবু, ৫৪ জাতের কাঁঠালসহ বিভিন্ন ওষধি গাছের চারা সংরক্ষিত রয়েছে। অ্যাভোকাডো, ড্রাগন ফল, রামবুটান বা ওয়াইল্ড লিচি’র মতো বিদেশী ফলের চারাও মিলবে এখানে।

কিভাবে যাবেন:

সড়ক ও রেলপথে যেতে পারেন ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে। ঢাকার মহাখালী থেকে বেশ কিছু বাস প্রতিদিন ময়মনসিংহে যায়। শহরে নেমে অটোরিক্সা বা সিএনজি ভাড়া করে আপনি এই স্পটগুলো ঘুরতে পারবেন। শশীলজ, ক্যাসেল ও জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা আপনি ডে ট্যুরেই কমপ্লিট করতে পারবেন। তবে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি দেখতে হলে হোটেলে থাকতে হবে। এখানে অনেকগুলো হোটেল রয়েছে রাত্রিযাপনের জন্য।

Tags

Add Reviews & Rate

You must be logged in to post a comment.

Sign In ভ্রমণবন্ধু

For faster login or register use your social account.

or

Account details will be confirmed via email.

Reset Your Password