ভ্রমণবন্ধু

পদক্ষেপে পদক্ষেপে স্মৃত-বিস্মিত

পদক্ষেপে পদক্ষেপে স্মৃত-বিস্মিত

শুরুতেই বোঝাপড়াটা সেরে নেয়া দরকার। প্রথমত, এই ভ্রমণ গল্পটা যে স্থানের, সেখানকার পরিচয়-বৃত্তান্ত পাঠকরা গুগল আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কমবেশি জানেন। কাজেই গণিতভিত্তিক কোন ব্যাখ্যায় আমি যাব না। করোনায় আক্রান্ত হবার পর ভোঁতা হওয়া মগজে একটু শান দেয়ার চেষ্টা এই লেখা। তাছাড়া ভ্রমণ না হলে এ নিয়ে লেখাটাও সবল হয় না।

কাটাকুটি খেলায় হারজিতের হিসাব এড়িয়ে সংখ্যা দাঁড়াল ৭ এ। ব্লেস, স্বপ্নীল, অনামিকা, অর্ঘ্য, তনু, ক্লিপটন আর আমি। এমনিতেই করোনার সংক্রমণ রোধে বিধিনিষেধ স্থগিতের পর ভ্রমণস্থানে মানুষের গা ঠেসাঠেসি ভিড়, তার ওপর বৃহস্পতিবার, সব মিলে যান আর জনজট ঠেলতে ঠেলতে ঢাকা থেকে সাড়ে ১১টায় রওনা হয়ে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের নয়দুয়ারীবাজারে পৌঁছাই ভোর ৬টায়। যা ভেবেছিলাম, তাই। ট্রেকার, ভ্রমণকারী আর পর্যটকরা কিলবিল করছে।

ছবি- লেখক ও তার দল

এমনিতেই করোনার সংক্রমণ রোধে বিধিনিষেধ স্থগিতের পর ভ্রমণস্থানে মানুষের গা ঠেসাঠেসি ভিড়, তার ওপর বৃহস্পতিবার; সব মিলে যান আর জনজট ঠেলতে ঠেলতে ঢাকা থেকে সাড়ে ১১টায় রওনা হয়ে মিরসরাইয়ের নয়দুয়ারী বাজারে পৌঁছাই ভোর ৬টায়। যা ভেবেছিলাম, তাই। ট্রেকার, ভ্রমণকারী আর পর্যটকরা কিলবিল করছে।

আমরা চলেছি নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে। মূল সড়কের মোড় থেকে ট্রেইলের শুরু পর্যন্ত, ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে রেস্তোরাঁ, ফেরিওয়ালা, টয়লেট, কাপড় বদলার স্থান, বাঁশের লাঠি-অ্যাঙ্কলেট-জার্সি-শর্টস-স্যান্ডেলের দোকানের পসরা; এগুলো কিনতে পারার পাশাপাশি ভাড়াতেও মেলে। গাইড শাহাদাতকে সাথে নেই ইচ্ছা করেই, পরে অবশ্য বেশ উপকারে এসেছিল সে (এই ট্রেইলে গাইড না হলেও চলে)। আগে এসব পথে শুধু ট্রেকাররা আসতো। ক্রমশ পরিচিতি পাওয়াতে ভ্রমণকারী ও পর্যটকরাও আসে এখন। এর ভাল দিক হচ্ছে, স্থানীয়দের জীবিকা অর্জন হচ্ছে এবং এগুলো একসময় পর্যটন কেন্দ্র হবে। সম্প্রতি বনবিভাগ ও আর স্থানীয়দের প্রচেষ্টায় টিকিট কাউন্টারও হয়েছে, ২০ টাকা টিকিট।

খারাপটা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিবেচনায় যেখানে মানুষ বেশি যায়, সেখানেই যথেচ্ছাচার হয়, প্রকৃতি হয় বিনষ্ট। আমাদের এবারের সফরে যেসব দলের দেখা মিললো, তাদের প্রায় শতভাগই যথেচ্ছাচারী। কেউ চেঁচামেচি করছে, চিৎকার করে কথা বলছে, কেউ উচ্চস্বরে গান গাইছে, কোমরে সাউন্ডবক্স ঝুলিয়ে কানফাঁটা শব্দে গান শুনছে, অপচনশীল দ্রব্য এদিক ওদিক ফেলছে, প্রকৃতি ধ্বংসের জন্য আদিবাসীদের দায়ী করছে, অন্যান্য দলের নারীদের নিয়ে যা তা বলছে, আরও কতো কী! অথচ প্রকৃতিপ্রেমীরা কিন্তু উল্টোটা করে। চুপচাপ শোনে প্রকৃতির নানান শব্দ, অপচনশীল দ্রব্যগুলো নিজেদের সাথেই রাখে, পরে শহরে এসে ট্র্যাশবিনে ফেলে দেয়, ট্রেইলে নিজেদের পাশাপাশি অন্য কোন দলকে প্রয়োজনে সহযোগিতা করে, স্থানীয়দের সাথে ভাল ব্যবহার করে।

তো, ট্রেইলের শুরুতে টিলা আর পাহাড়ে আদিবাসী ত্রিপুরাদের গ্রাম দেখে মন খারাপ হয়ে গেল, তারা দরিদ্র এবং নাগরিক সুবিধায় অনেক অনেকখানি অবহেলিত।

ছড়া বা ঝিরিপথে শুরু নাপিত্তাছড়া; এই ট্রেইলের ঝর্ণাগুলোর নাম নিয়ে মতভেদ রয়েছে। প্রকৃতিজুড়ে বিস্ময় ছড়িয়ে থাকে, যদি কেউ খুঁজে নিতে পারে। আমি বরাবরই পাই। একইসঙ্গে আগেরবারের স্মৃতি পদে পদে এসে ঘুরপাঁক খাচ্ছিল মগজে। ঝিরিতে পানি কম দেখে সঙ্গীদের সবার মন খারাপ; শাহাদাত বললো, ঝর্ণাতেও পানি কম, না হয়েও উপায় নেই, কয়েকদিন ধরে যে টানা রুদ্র রৌদ্র। হ্যাঁ, অবশ্যই ঝর্ণাকে পূর্ণ যৌবনা দেখতে চাইলে বৃষ্টি থাকতে হবে, যেতে হবে বর্ষাকালে। আসলে সঙ্গীদের প্রবল উৎসাহে এবারের ভ্রমণের সিদ্ধান্ত। এমন ভাবতে ভাবতে প্রথম প্রপাতের সামনে আমরা, নাম টিপরাখুম। উচ্চতায় ছোট ও চওড়া কলেবরের পাথুরে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ভাদ্রের জল। এর পাশ দিয়ে কিছুটা উঠলেই কুপিকাটা খুম বা কুপিকাটা ঝর্ণা, যার সামনেরটা বেশ গভীর। শাহাদাত তো অনায়াসে সাঁতরে ঝর্ণার কাছে পৌঁছে ধাই ধাই করে ঝর্ণার ওপরে গিয়ে আবার দৌঁড়ে নেমেও গেল। সে কি কাণ্ড! ক্যামেরার শাটারের খেলা শেষ করে আমরা পাহাড়ে চড়াই করে একটা টং দোকানের সামনে বিশ্রাম নেই। কুপিকাটা খুম থেকে দোকান পর্যন্ত ওঠার সুবিধার্থে দড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নাপিত্তাছড়া ট্রেইলটা অদ্ভূত সুন্দর। কোথাও সমান, কোথাও বন্ধুর, কোথাও মসৃণ, কোথাও পিচ্ছিল, পাথরের খাঁজে খাঁজে কাঁকড়া আর চিংড়িদের ছোটাছুটি, দুপাশ টিলা আর পাহাড় ঘেরা, জানা অজানা গাছের সারি, আর কোন না কোন পাখির কলরব তো রয়েছেই, আর রয়েছে ফড়িং-প্রজাপতির ছোটাছুটি, রয়েছে জাল বুনে অপেক্ষমান শিকারী মাকড়সা। একটা মোড় পড়ে, ডানে গেলে বান্দরখুম, বামে বাঘবিয়ান। ঝর্ণায় পানি বেশি থাকলে দূর থেকেও শব্দ মেলে। আমাদের একেবারে কাছে গিয়েই শুনতে হলো।

এখন সামনে বান্দরখুম। ওপর থেকে অমল ধবল পানি পতনের পর এক জায়গায় এসে দুভাগ হয়ে গড়ায়, মাঝে ঝর্ণার গায়ে ছোট ছোট গাছ। আসলে লেখার বর্ণনায় সৌন্দর্যের পূর্ণ আস্বাদন অসম্ভব, চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা নিতেই হবে। বাঘবিয়ানের মুখোমুখি হয়েও অপার বিস্ময়ানন্দে নীরবে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফোঁটে। এই ঝর্ণা দুপাশের পাহাড় দিয়ে বেশ চাপা, সরু কিন্তু উঁচু, ওপরের পানি ঝর্ণার মাঝে পাহাড়ের গা থেকে বের হওয়া পাথরে বাড়ি খেয়ে নিচে আছড়ে ও গড়িয়ে পড়ছে। নিচে ছোট্ট করে আসনের মতো, পালা করে জলধারা সেখানে বসে। আমরা ফিরতি পথ ধরি। ভাবছিলাম, প্রকৃতির সাথে নারীর কী অদ্ভূত মিল!

অর্ধেক পথের পর আলাদা আরেকটি পথে ট্রেইল শেষ করি। শাহাদাতকে বিদায় জানিয়ে আমরা সীতাকুণ্ড বাজারের পথে। সেখানে পেটপুজো। এরপর গন্তব্য ছিল গুলিয়াখালী সৈকত। কিন্তু সঙ্গীদের মধ্যে কারও কারও শরীরে না কুলানোয় ঢাকার বাসে উঠে পড়ি। ফিরতে হয় আমাদের। আমার মন আবারও খারাপ হয়। এখনও ভ্রমণে গেলে ফেরার সময় প্রচণ্ড মন খারাপ হয়।

নাপিত্তাছড়া ট্রেইল থেকে ঘুরে এসে লিখেছেন – জুয়েল থিওটোনিয়াস

Tags

Add Comment

You must be logged in to post a comment.

Sign In ভ্রমণবন্ধু

For faster login or register use your social account.

or

Account details will be confirmed via email.

Reset Your Password