ভ্রমণবন্ধু

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার পাবনার দিলপাশার বিল

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার পাবনার দিলপাশার বিল

করোনা পরিস্থিতির কারণে ঘরে বন্দী থাকতে থাকতে জীবনটা কেমন যেন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল। মন ছুটে যেতে চাচ্ছিল কোনো এক খোলা জায়গায়। যেখানে গেলে মন ভালো হয়ে যাবে। কারণ খুব তাড়াতাড়ি মন ভালো  করার সবথেকে সহজ উপায় হলো কোথাও বেড়াতে যাওয়া। বিশেষ করে প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া।

লেখক- আব্দূন নূর মারুফ

প্রকৃতির কথা মনে পড়লেই আমার মনে পড়ে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এর লেখা কবিতা গুলোর কথা। প্রকৃতিকে মনে হয় তার থেকে বেশি ভালো করে আর কেউ উপস্থাপন করতে পারেনি।

তার ভাষায় প্রকৃতি হলো,

“The anchor of my purest thoughts, the nurse

The guide, the guardian of my heart, and soul

Of all my moral being.”

চোখ বন্ধ করতেই চোখের সামনে কল্পনায় ভেসে উঠলো “মাথার ওপরে পরিস্কার নীল আকাশ, নিচে সবুজ গাছপালা ঘেরা সরু কাঁচাপাকা রাস্তা, মাঝে মাঝে সে রাস্তা দিয়ে কেউ কেউ হেঁটে যাচ্ছে, রাস্তার দু’পাশে বর্ষার পানি, বিস্তৃত বিশাল বিল, পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি পানির মধ্যে যেন এক আকাশ, প্রাণ জুড়িয়ে দেওয়া মধুর বাতাস, পানিতে ভেসে চলছে ছোট-বড় কত রকম নৌকা…”

মনের অজান্তেই বলে উঠলাম আরে এ তো আমাদের দিলপাশার বিল! ব্যাস, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম এখানে যেতে হবে! আমরা অনেকেই অনেক সময় ও অর্থ খরচ করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যাই। প্রকৃতি ও সুন্দরের কাছে যাবার জন্য। অথচ আমাদের দেশে খুব কাছেই আছে এমন কিছু যা আপনি অনেক দূরে গেলেও হয়তো দেখতে পাবেন না। এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতার কথা মনে পড়ে,

“…দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে

একটি শিশিরবিন্দু।”

 চলুন আপনাকে আজ দিলপাশার বিলের গল্প বলি।

দিলপাশার অবস্থান

ছবি- মারুফ

দিলপাশার ইউনিয়ন পাবনা জেলার চলন বিল বিধৌত একটি ইউনিয়ন। এর পূর্বে সিরাজগঞ্জ জেলার লাহিড়ী মোহনপুর ইউনিয়ন, উত্তরে সিরাজগঞ্জ জেলার উধুনিয়া ইউনিয়ন, দক্ষিণে পাবনা জেলার বিএল বাড়ী ইউনিয়ন এবং পশ্চিমে পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া ইউনিয়ন।

ভেীগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে এটি অত্যান্ত প্রত্যন্ত অঞ্চল। তবে এলাকার স্থানীয় রাস্তাগুলো বেশ ভালো। সারাবছর স্থানীয় মানুষ ছাড়া তেমন কারো যাতায়াত হয়না। বর্ষা কালে এখানে প্রকৃতি প্রেমীদের ভির জমে। সকালে বিকালে প্রচুর মানুষ আছে প্রায় প্রতিদিনই। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড় একটু বেশি থাকে। অনেকে আবার নৌকায় করে বেড়াতে আসে বিভিন্ন এলাকা থেকে।

প্রকৃতির অপরুপ সাজ আর ভ্রমণ প্রিয়াসী মানুসদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে ওঠে দিলপাশার রেল স্টেশন। দিলপাশার ইউনিয়ন পরিষদ ভবন জেলার সিমান্ত অঞ্চল দিলপাশার রেল ষ্টেশনের খুব কাছেই অবস্থিত। চলন বিলের মধ্য দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন। শরৎনগর এবং লাহিড়ী মোহনপুর এর মাঝ খানে দিলপাশার রেল স্টেশন।

দিলপাশার ইতিহাস

ছবি- মারুফ

দিলপাশা পাবনা জেলার ভাগুড়া উপজেলায় অবস্থিত একটি বিল, যা চলন বিলের একটি অংশ। অসাধারণ সুন্দর পরিবেশ। রেল লাইন চলন বিলের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্ষাকালে বর্ষার পানিতে রেললাইন ডুবে যায়। আর সেই ডুবে যাওয়া রেল লাইনের উপর দিয়েই যায় রেল। রেলের চাকার ধাক্কায় লাইনের উপরে থাকা পানিগুলো দু’পাশে ছিটকে সরে যায়। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন পানির মধ্যে দিয়েই রেল গাড়ি যাচ্ছে। অসাধারণ সুন্দর একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়।

শরনগর এবং লাহিড়ী মোহনপুরের মধ্যে দিলপাশার রেলওয়ে স্টেশন আছে, সেখানে শুধুমাত্র লোকাল ট্রেন স্টপ আছে। ব্রিটিশরা এখানে এই বিলের মাঝে রেলস্টেশন তৈরি করে। ব্রিটিশরা এই দিলপাশা বিল থেকে কলকাতায় মাছ নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি এটি করেছিল। প্রতিবছর বর্ষার মৌসুমে এখান থেকে কলকাতায় মাছ পাঠানো হতো। একবার এখান থেকে প্রচুর মাছ কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল।

বর্ষা মৌসুমে শুধু মাছ পাঠানো নয়, সারাবছর মানুষের চলাফেরা এবং যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হতো এই দিলপাশার রেল স্টেশন। আট থেকে দশটি ট্রেন সারাদিন চলাচল করত। যখন এত যানবাহন ছিলনা তখন সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া ও তাড়াশ,  পাবনা জেলার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর এই এলাকার মানুষদের চলাফেরার একমাত্র মাধ্যম ছিল এই স্টেশন।

বর্তমানে ইন্টারসিটি রেল সার্ভিস চালু হওয়ার কারণে এই এলাকায় এবং স্টেশন অবহেলায় পড়ে আছে।  এখানে  লোকাল রেলগাড়ি ছাড়া আর কোন রেল থামেনা। এই এলাকার মানুষদের চলাচলের একমাত্র অবলম্বন হলো বর্ষার সময় নৌকা।

কিভাবে যাবেন?

পাবনা শহর থেকে খুব সহজে সিএনজি মাধ্যমে চাটমোহর হয়ে ভাঙ্গুড়ার এই দিলপাশা ইউনিয়নে পৌঁছাতে পারবেন। পাবনা থেকে যেতে এক ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময় লাগবে। আপনি চাইলে আপনার নিজস্ব বাইক বা প্রাইভেট কার নিয়ে যেতে পারবেন।

রাস্তাঘাটের অবস্থা বেশ ভালো। আঁকাবাঁকা রাস্তা, দুপাশে বড় বড় গাছ, একদম সবুজ পরিবেশ। আপনার গন্তব্যের দিলপাশা বিল যেমন অসম্ভব সুন্দর, ঠিক তেমনি সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা এবং রাস্তার দু’পাশের পরিবেশ সুন্দর। যেতে যেতে চাইলে দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে চা খেতে পারবেন। কিংবা গাড়ি থেকে নেমে সুন্দর প্রকৃতিতে ছবিও তুলতে পারবেন।

তবে বিল দেখে ফিরে আসার সময় চাটমোহরের বিখ্যাত রসমালাই না খেয়ে আসবেন না। এটা না খেলে বিশাল বড় মিস হয়ে যাবে।

দিলপাশার বিলের সৌন্দর্য

পাবনার দিলপাশার বিল
ছবি- মারুফ

সৌন্দর্য কখনো শব্দের দ্বারা বিশ্লেষণ করা যায় কি?

দিলপাশার বিলের সৌন্দর্যের বিষয়টি বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আপনি এর প্রতিটি ছোট ছোট বিষয়ে সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন। বিলের পরিবেশ, রাস্তাঘাট, বিলে ভেসে যাওয়া মাছ ধরা নৌকা, ধানবাহী নৌকা, কিংবা ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের পিকনিকের নৌকা, কখনো কখনো দূরে নৌকা থেকে ভেসে আসছে গান।

যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর আকাশ, পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে ছোট-বড় অনেক নৌকা আর আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা সাদা মেঘ, কখনো কখনো পাখি উড়ে যাচ্ছে দূর বা কাছ দিয়ে, বিলের পানিতে ছোট ছোট স্রোত সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করে উঠছে, প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছে বিলের শীতল নরম বাতাস। চোখ এবং মাথা থেকে যেন হাজার বছরের ক্লান্তি ঝরে পড়ছে।

বিলের দুই পাশের রাস্তায় বড় বড় সবুজ গাছের সারি, গাছের পাতার ফাঁকে বিস্তৃত সাদা মেঘে ভাসা নীল আকাশ, বিলের মাঝে জেগে ওঠা চরে মহিষের চলাফেরা, কৃষকের ধান কাটা, বাড়ির মেয়ে ও মহিলাদের বিলের পানিতে কাপড় কাচা সবকিছুই আপনাকে মুগ্ধ করবে। মনে হবে বিলের পাশে এই গাছ তলায় বসে অনন্তকাল কাটিয়ে দেই।

দিলপাশার মানুষদের জীবন ও জীবিকা

পাবনার দিলপাশার বিল
ছবি- মারুফ

দিলপাশার মানুষদের জীবন ও জীবিকার একমাত্র উৎস্য হল কৃষিকাজ। তবে বর্ষার মৌসুমে দিলপাশার এই বিল হয়ে ওঠে এই এলাকার মানুষের জীবন ও জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। তারা নৌকা চালানো, মাছ ধরা এবং মাছ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এলাকার প্রধান ফসল ধান। এলাকার ধানের বেশ সুনাম আছে। নাটোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখানে ধান কিনতে আসেন।

শেষ কথা

আপনি যদি একজন প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণপিপাসু মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলে দিলপাশার বিল দেখে আপনি মুগ্ধ হবেন। বিলের মনমুগ্ধকর প্রকৃতি আপনাকে ধরে রাখতে চাইবে। তবে আসার সময় অবশ্যই চাটমোহরে বাওসার বিল দেখে আসবেন। আপনার প্রশ্ন ও মতামত আমাদের জানাতে ভুলবেন না।

পাবনার দিলপাশার বিল থেকে ঘুরে এসে লিখেছেন – আব্দূন নূর মারুফ

Tags

Add Comment

You must be logged in to post a comment.

Sign In ভ্রমণবন্ধু

For faster login or register use your social account.

or

Account details will be confirmed via email.

Reset Your Password